আমিও তবে ক্লান্ত বুড়িটির মতো
দেহভারে ন্যুব্জ – বৃদ্ধা – অবসন্ন -।
ব্যাপ্তি আমার ধূসর পান্ডূর –
পথভারে রক্তিম -।
বাঁধটুকুর চিহ্নমাত্র নেই কোথাও।
শ্রাবনে বুকে আমার
শৈশব, কৈশোর – খেলা করে – ছবির মতন।
গ্রীষ্মে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস – হাহাকার – বুক জুড়ে –
দেহাতি মিঠে রোদে মনে পড়ে – শীত এসে গেছে।
পরিচিত পরিযায়ী পাখিদের একটানা স্তব –
শীর্ণ শরীরে আমার –
অবিরাম অবিশ্রান্ত – ক্লান্তিহীন – সময়।
একদিন আমাকেও চলে যেতে হবে –
ইতিহাস মেনে নেবে সব –
আরো কত পথ – কত সময় -।
তবু বুকে যদি হঠাৎ কোনো প্লাবন আসে –
তিস্তা – তোর্সা – অথবা জলঢাকা নদীটির থেকে –
ফিরে আসা – হঠাৎ কোনো প্লাবন বলে –
চলো চলে যাই – আবার দুহাতে দুহাত ধরে –
দেশ – গ্রাম – জনপদ ছেড়ে – অমৃতের সন্ধানে -।।
মেয়েটা যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
বাবার দিকে একটু লক্ষ্য রেখো মা
ভাই যেন ঠিকঠাক পড়াশুনা করে;
আরও বলেছিল- তোমাদের ছাড়া থাকতে পারবো না আমি…
ওর বিদায় লগ্নে –
শঙ্খ আর উলুধ্বনির তরঙ্গের সাথে
ভেসে গিয়েছিল আমাদের অব্যক্ত ব্যাথা দুর-দুরান্তে!
ভাবতে অবাক লাগে-
একটা মেয়ে রাতারাতি কেমন করে
এক নারীতে পরিনত হয়।
মেয়েটার কথামত লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখেছি
লোকটা ক্রমশ পাথরের মতো নির্বাক – নিরুৎসাহ,
জীবনের সব সুখ আনন্দ …
গ্রীষ্মের ডোবা পুকুরের জলের মতো
হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
ছেলেটা – ছেলেটা দিদির সংসারে সুখের জন্য
পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে
একটা মুদীর দোকানে কাজ করে।
মনে পড়ে-
ওরা যখন অষ্টমঙ্গলায় এসেছিল-
দারুন উৎফুল্ল ছিল মেয়েটা,
খুশীতে মুখখানি যেন পুর্নিমা চাঁদের মতো উজ্জ্বল
পাহাড়ী ঝর্নার মতো কল্লোলিনী সে।
যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
আমি খুব ভাল আছি মা।
তারপর ছ’মাসের মাথায় যখন এলো-
যেন চাঁদের গায়ে ছাপ ছাপ অন্ধকার
অনেকটা মলিন – ম্রিয়মান সে।
আমার কানপাশা জোড়া দেখতে না পেয়ে বলেছিল-
ওদের জন্য আর কত করবে মা?
যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
ওখানে আর ভাল লাগে না…
এক বছরের মাথায় মেয়েটা একাই এসেছিল;
তখন একেবারে বিধ্বস্ত-হতাশ,
লাল নীল হলুদ পছন্দের কয়েকটা শাড়ী
কিছু গয়না রেখে দিয়ে বলেছিল-
ও গুলো আর ভাল লাগে না মা ।
যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল-
আর কবে আসবো জানি না…
মেয়েটা আর কোনদিন ফিরে আসেনি-
শুধু একটা ফোন এসেছিল…
মাঝরাতে কিংবা ভোরের আগে।
সেদিন হয়তো আর ভোর হয়নি-
ভোরের পাখীগুলি আর কলোরব করেনি।
শুধু একটা কাক ডাকছিল ছাদের কার্নিশে
বুকটা আমার ব্যাথায় ভেঙে যাচ্ছিল!
মেয়েটার জীবনে আর কোনদিন ভোর আসেনি-
ভোরের আলো ফোটেনি।
মেয়েটা কোনদিন আর ফিরে আসেনি-
কোনদিন আর কিছু বলেনি…
আমারে রেখেছি গোপন
দেখা হীন অদেখায়, কথাহীন না বলায় ।
আমি রয়েছি তোমার কাছাকাছি
তবুও যে আমি অনেক দূর দুরান্তে ।
পথহীন পথের দিশায় ,
ঠিকানাহীন আপনের সন্ধানে ।
এই ছুটে চলা যেন আমার প্রতিদিনের,
আমারে আমি করেছি অচেনা, আমার হতে ।
সন্ধ্যার আকাশে মেঘ হয়ে ভাসতে ভাসতে
আমি চলে যাব অনেক দূরে ।
মধ্য রাতের কোন এক সময়ে বর্ষা হয়ে পড়ব’
আমার সকল চেনা অচেনা সিমান্তে ।
যে টুকু অবশিষ্ট থাকবো
শেষ রাতে শিশির হয়ে অঝরে ঝরবো
তোমার আঙিনায় সবটুকু জুড়ে ।
আমি আরও – অনেক গভীর ঘুম চাই –
যে ঘুম তোমার তরল বাসনার থেকেও মদির –
তোমার অসূর্যস্পর্শা অধরের থেকেও গাঢ।
তোমার ললাটের থেকেও দীঘল –
তোমার বায়বীয় আত্মার থেকেও নশ্বর –
ঘুম চাই ।
তোমার নাটকীয় চাহনির থেকেও পরকীয়া –
এমন এক ঘুম চাই ।
ক্লান্ত কারা যেন বলে গেলো
দেখা হবে আজ|
সকাল থেকে তৈরি হয়েছি|
স্মৃতি থেকে তুলি করে তুলে
এনেছি তোমার সাথে কাটানো
মন কেমন করা বিকেলের রঙ|
যত্নে লাগিয়েছি গালে|
কথা ছিলও দেখা হলে
ধরা দিতে হবে|
এখন শুধু তারই অপেক্ষা|
মেঘ রঙা কাজল চোখে দেওয়ার
বড়ো সাধ| তবু মনে ভয়|
মেঘেই তো লুকিয়ে বৃষ্টি|
রক্তাক্ত ঠোঁটে অভিসারে যাই|
Recent Comments